মুতরী

অনুবাদ: আখতার-উন-নবী

কংগ্রেস হাউজ এবং জিন্না হল থেকে সামান্য কিছু দূরে একটি প্রস্রাবখানা আছে। সেটাকে বোঘের লোকেরা মুরী বলে। আশে-পাশের বিভিন্ন মহল্লার যাবতীয় ময়লা আবর্জনা সেই দুর্গন্ধময় কুঠুরীর বাইরে সব সময় স্তূপাকারে পড়ে থাকে। এমন দুর্গন্ধ ছড়ায় যে, মানুষকে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বাজার থেকে ফিরতে হয়।

একবার বড় অপারগ হয়ে তাকে সেই মুরীতে প্রবেশ করতে হয়—পেচ্ছাব করার জন্যে। নাকে রুমাল চেপে শ্বাস বন্ধ করে সেই দুর্গন্ধময় স্থানটিতে প্রবেশ করে। সারা মেঝেতে ময়লা-আবর্জনা বুদ্বুদের মতো ফুটে রয়েছে। দেয়ালগুলোতে মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যক্ষের ছবি বড় বিশ্রীভাবে চিত্রিত করে রেখেছে। সামনে কয়লা দিয়ে কে যেন লিখে রেখেছে—‘মুসলমানো কি বহেন কা পাকিস্তান মারা’।

শব্দগুলো দুর্গন্ধের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় যেন। সে তাড়াতাড়ি রেরিয়ে আসে।

জিন্না হল এবং কংগ্রেস হাউজ দুটোই সরকারের দখলে, কিন্তু তার সামান্য দূরে যে মুতরী অবস্থিত—তা সম্পূর্ণ বেদখলে যেন নিজের যাবতীয় দুর্গন্ধ ছড়াবার জন্যেই। আশেপাশের বিভিন্ন ময়লা পচা-আবর্জনা এখন আরো বেশী জমতে দেখা যায়।

আর একবার তাকে বাধ্য হয়ে সেই মুতরীতে যেতে হলো ৷ পেচ্ছাব করতে তা বলাই বাহুল্য। নাকে রুমাল চেপে শ্বাস বন্ধ করে সেই কুঠুরীতে প্রবেশ করলো। মেঝেতে পাতলা পায়খানার ছোট ছোট রুটি যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দেয়ালে দেয়ালে মানুষের বংশ বৃদ্ধি করার অঙ্গের সংখ্যা যেন আরো অনেক বেড়ে গেছে। ‘মুসলমানো কি যহেন কা পাকিস্তান মারা’-এর নীচে কে যেন মোটা পেন্সিল দিয়ে ঘন শব্দ কাঁটা লিখে দিয়েছে—‘হিন্দুও কি মা কা অখণ্ড হিন্দুস্থান মারা’।

লেখাটা মুতরীর দুর্গন্ধের মধ্যে যেন কড়া এসিডের উগ্রতা এনে দেয়। সে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে।

মহাত্মা গান্ধী বিনাশর্তে মুক্তি পেলেন। জিন্না পাঞ্জাবে পরাজয় বরণ করেন। জিন্না হল এবং কংগ্রেস হাউজ দুটো না পরাজিত হলো, না মুক্তি পেলো। ওদের ওপর সরকারের এবং সামান্য দূরে অবস্থিত মুতরীটির ওপর দুর্গন্ধের কব্জা পুরোদস্তুর চলতেই থাকে। আশেপাশের মহল্লার বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা স্তূপাকারে বাইরে জমতেই থাকে।

তৃতীয়বার আবারো তাকে সেই মুতরীতে যেতে হলো— পেচ্ছাব করতে। নাকে রুমাল রেখে, শ্বাস বন্ধ করে সেই ময়ল৷ আবর্জনার কুঠরীতে প্রবেশ করলো। মেঝেতে ময়লা পোকা কিলবিল করছিলো। দেয়ালগুলোতে মানুষের লজ্জাস্থানের নকশা আঁকার জন্যে আর কোন জায়গা খালি নেই। ‘মুসলমানো কি বহেন কা পাকিস্তান মারা’ ‘হিন্দুও কি মা কা অথণ্ড হিন্দুস্থান মারা’—লেখাগুলো প্রায় অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই লেখাগুলোর নীচে সাদা মাটি দিয়ে লিখিত কথা ক’টি বড় স্পষ্ট আকারে জ্বলজ্বল করছিলো—‘দুনো কি মা কা হিন্দুস্থান মারা’।

এই লেখাটা মুহূর্তের জন্যে যেন মুতরীর যাবতীয় দুর্গন্ধ দূর করে দেয় ৷ সে যখন আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছিল, তখন তার কাছে মনে হলে। যেন দুর্গন্ধের এই ঘর এক অজানা সুগন্ধে ভরে গেছে, স্রেফ এক মুহূর্তের জন্যে!

সেই মেয়েটি, সাদাত হাসান মান্টো, অনুবাদ: আখতার-উন-নবী, বাংলা বাজার, ঢাকা, আগস্ট ১৯৭৯

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice